বেশ কিছুদিন পূর্বে মহানবী (সঃ)-কে কটাক্ষ করে নির্মিত একটি ভিডিও আপলোড করার পরবর্তীতে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ভিডিও শেয়ারিং ওয়েবসাইট, ইউটিউব বাংলাদেশে ব্লক করে দেয়া হয়েছে। যদিও ভিডিওটির বিষয় অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে ও ধর্মানুভুতিতে আঘাত হানতে বাধ্য, কেউ কি ভেবে দেখেছি বিষয়টির ফলাফল কি হতে পারে? ইউটিউবই কি একমাত্র ওয়েবসাইট যেখানে ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মমতের অবমাননা করা হয়? বাংলাদেশে কেন ইউটিউবের পক্ষ থেকে ভিডিওটিকে ব্লক করে দেয়া হয়নি? অন্য কোথাও কি এই ভিডিওটি পাওয়া যাবে না, ইউটিউব ছাড়া? এই প্রশ্নগুলো উত্তর দিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণাকে দূরীকরণের উদ্দেশ্যেই আমার এই লেখাটি।

ইউটিউব আসলে কি?

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলি, আমার এলাকার কয়েকজন মুরুব্বি নামাজের পর চায়ের দোকানে বসে ইউটিউবের সমালোচনা করছিলেন, বেশ ভালোভাবেই! আমি তাদেরকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আঙ্কেল, ইউটিউবে কি হয়েছে?” তাঁদের মতে ইউটিউব এমন একটি ওয়েবসাইট যেখানে শুধুই ইসলামকে অবমাননা করে ভিডিও আপলোড করা হয়! প্রযুক্তিবিষয়ক জ্ঞানের অভাবে এইসকল মানুষের মধ্যে এত বড় ভুল ধারণা কারা সৃষ্টি করেছে? আমরাই, যারা নিয়মিত প্রযুক্তি ব্যবহার করি।

ইউটিউবে কি আছে?

ইউটিউবে যে কেউ, যেকোন ভিডিও (গাইডলাইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে) আপলোড করে সমগ্র বিশ্বের সঙ্গে শেয়ার করতে পারে। সেটি হতে পারে আপনার জন্মদিনের, বিয়ের বা বাচ্চার হাতেখড়ির অনুষ্ঠানের ভিডিও। ইউটিউব বর্তমানে শিক্ষার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

বাংলাদেশে বংশোদ্ভূত সালমান খানের প্রচেষ্টার ফসল Khan Academy ইউটিউবে তাদের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, জীববিজ্ঞান, ক্যালকুলাস, পরিসংখ্যান, অর্থনীতি প্রভৃতি বিষয়ক অত্যন্ত আকর্ষণীয় ভিডিও লেকচার সংরক্ষণ করেন। বিশ্বের মিলিয়ন-মিলিয়ন শিক্ষার্থী এসকল ভিডিও দেখে কঠিন পাঠগুলো সহজেই আয়ত্ত করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে আমার কথা বলতে পারি। নবম শ্রেণিতে ওঠার পর প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় রসায়নে খুবই খারাপ ফলাফল করেছিলাম, বইয়ের বিষয়বস্তু না বোঝার দরুন। খান অ্যাকাডেমীর ভিডিও দেখে বিষয়টি আমি পুরপুরি আয়ত্ত করতে পারি এবং পরবর্তীতে ক্রমে ভালো ফলাফলের দিকে অগ্রসর হই।

আপনি সম্ভবত ড. জাকির নায়েকের মত বেশ কয়েকজন ইসলামবিদের নাম শুনেছেন। তাদের লেকচারগুলোর ভিডিও কিন্তু ইউটিউবে দেখা যায়। কুরআনের তিলাওয়াত, ইসলামী জীবনযাপন সংক্রান্ত ভিডিও, সবই পাবেন ইউটিউবে। মজার বিষয়টা খেয়াল করেছেন কি? ছবিতে দেখুন, কেবল জাকির নায়েকের লেকচারের ভিডিওই রয়েছে ৬৩,০০০ এর উপরে! ইউটিউব ইসলামিক কন্টেন্টে কতটা রিচ তা আপনার কল্পনার বাইরে! অবশ্য, এখন আর দেখবেনই বা কি করে, ইউটিউব তো বন্ধই করে দিয়েছে সরকার।

ফ্রীল্যান্সার এবং প্রযুক্তি বিষয়ক ক্যারিয়ার গঠনে আগ্রহীদের তীর্থস্থান হল ইউটিউব। সুন্দর সব ভিডিও টিউটোরিয়ালের মাধ্য দিয়ে প্রযুক্তি জটিল সকল বিষয় সহজেই বুঝিয়ে দেয়া হয় এ সকল ভিডিওতে। ওয়েবসাইট তৈরি, প্রোগ্রামিং করা, গ্রাফিক্স এডিটিং, কম্পিউটার সারাই কি নেই এখানে! কিন্তু, এত জ্ঞানের ভাণ্ডার থেকে আজ আমরা বঞ্চিত। তাছাড়া, ইউটিউবে ভিডিও আপলোড করে যেসকল ফ্রীল্যান্সার আয় করতেন, তাদের আজ কি অবস্থা?

আপনি কোন মুভি, নাটক বা গান চান? সেটিও আছে ইউটিউবে। শরীর ফিট রাখার জন্য ব্যায়াম শিখতে চান? তা শিখানোর জন্যও আছে ভিডিও টিউটোরিয়াল! কি নেই এখানে? বিনোদন, শিক্ষা ও মানুষের উপার্জনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউটিউব।

যত দোষ ইউটিউব ঘোষ

যদি আপনি মনে করেন ইন্টারনেটে কেবল ইউটিউবেই ইসলামকে অবমাননা করা হয়, তবে আপনি প্রকৃতপক্ষে অন্ধকার ঘরে বন্দি। কেননা, ইসলামকে অবমাননা করে অধিকাংশ কন্টেন্ট, আমি বলবো প্রায় সকল কন্টেন্টর উৎসই ফেসবুক। গুগল+ নয়, টুইটার নয়, ফেসবুকই। মহানবী, ইসলামকে ব্যাঙ্গ করে নির্মিত পেজের সংখ্যা হয়তো আমার এই আর্টিকেলের বর্ণের সংখ্যার চেয়েও বেশি। কিন্তু, দোষ কেন শুধু ইউটিউবের? ফেসবুকের শত শত পেজগুলোর কি কোন দোষ নেই? তাদের অবমাননা অপরাধ নয়? ইউটিউব সাধারণ মানুষের শিক্ষা, বিনোদন ও উপার্জনের স্থান। এটিই কি ইউটিউবের একমাত্র দোষ? আমি সঙ্গত কারণেই ফেসবুকপেজের লিংকগুলো দিচ্ছি না, সামান্য খোঁজ করলেই আপনারা এগুলো পেয়ে যাবেন। ফেসবুক পেজগুলো পার পেয়ে যাবে আর একটা ভিডিওর জন্য পুরো ইউটিউব বন্ধ হয়ে যাবে?

ভিডিওটি এখন আর কোথাই কি নেই?

আপনার অবগতির জন্য জানাচ্ছি, ভিডিওটি কেবল ইউটিউবেই সীমাবদ্ধ নেই। Blip.TV, Vimeo, Metacafe, Facebook, Dailymotion প্রভৃতি সাইটে এই ভিডিও ভাইরাসের মত ছড়িয়ে পড়েছে। লাভ হল কি ইউটিউব বন্ধ করে? (আবারও সঙ্গত কারণেই লিংক দিচ্ছি না)

সময় স্বল্পতার কারণে আমার লেখা সম্পূর্ণ করতে পারলাম না, আপনারাই ভেবে দেখুন, ইউটিউব ব্লক করা কতটা যুক্তিযুক্ত? ইউটিউব যে বন্ধ হল, এর জন্য ক্ষতির শিকার হচ্ছি আমরাই। গোটা বিশ্বের তুলনায় আমাদের ছোট্ট দেশটি থেকে পাওয়া ভিজিটর তাদের কাছে খুবই নগণ্য। ইউটিউব দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ হয়ে আছে, এমন অবস্থা চলতে থাকলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে, কমবে না। কি দোষ করেছিল সে শিক্ষার্থীটি যে খান একাডেমির ভিডিও না দেখতে পেরে গাইড কিনে নিজের মস্তিষ্ক বিক্রি করে দিয়েছে? কিংবা সে ওয়েব ডেভেলপারের, যে জ্যাঙ্গো শিখতে না পেরে একটি প্রজেক্টই বাতিল করে দেয়?

সৃষ্টিকর্তা বৈপরিত্যের মধ্য দিয়েই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। সবকিছুরই ভালো ও মন্দ দিক উপস্থিত, ইউটিউবও তার ব্যতিক্রম নয়। অতএব, মন্দ দিকটা না ধরে ভালো দিকের প্রতি আকৃষ্ট হবাই বুদ্ধিমানের কাজ! ইউটিউব বন্ধ করা মোটেও সন্তোষজনক পদক্ষেপ নয়। ইউটিউব বন্ধ করার এক অর্থ হল তথ্যের উন্মুক্ত প্রবাহ হতে আমাদের দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা। আমরা চাই যথাদ্রুত সম্ভব ইউটিউব ও গুগলের অন্যান্য ব্লক হয়ে যাওয়া পরিষেবা আমাদের মাঝে ফিরে আসুক।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s