ইন্টারনেটের ইতিহাস না জানলে দেখতে পারেন

Posted: ডিসেম্বর 1, 2012 in ইতিহাস, ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট, টিপস & ট্রিক্স, টেকবিশ্ব, তথ্য প্রযুক্তি, না জানা ঘটনা, নেটওয়ার্কিং, Top News

ব্রাউসার যুদ্ধ:

প্রতিদিন, প্রতিক্ষণে আমরা ইন্টারনেট ব্যবহার করছি। ভিডিও বা ছবি দেখছি, গান ডাউনলোড করছি। ইন্টারনেট এখন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু কতজন ভেবে দেখেছি বা অন্ততঃ জানার চেষ্টা করেছি এই ইন্টারনেটের আদি অবস্থা সম্পর্কে? কতজনই বা জানি ইন্টারনেটের ইতিহাস সম্পর্কে?

৯০’ এর দশকের গোড়ার দিকে কথা। তখনকার ইন্টারনেট আজকের ইন্টারনেটের থেকে ছিলো পুরোপুরি ভিন্ন। তখনকার ইন্টারনেট ছিলো মূলতঃ একটি গবেষণাধর্মী নেটওয়ার্ক যা বছর কয়েক আগে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী টিম বার্নার্স লি উদ্ভাবন করেছিলেন। ওই সময় ওয়েবসাইটের সংখ্যা ছিলো হাতে গোণা। আর যাও বা ছিলো তাতে ছিলো শুধু লাইনের পর লাইন বিরক্তিকর গবেষণাধর্মী লেখা। একান্তই “গিক” (Geek-টেকনোলজি বিষয়ক আঁতেল) না হলে কেউ সেই সময়কার ইন্টারনেট নিয়ে মাথা ঘামাতো না। সৌভাগ্যবশত সেরকমই কিছু গিকদের মধ্যে দু’জন ছিলেন ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্র মার্ক এন্ড্রিসেনএরিক বিনা
Nafis Iftekhar 1226144738 1 vlcsnap 90957 ইন্টারনেটের ইতিহাস না জানলে দেখতে পারেন
মার্ক এন্ড্রিসেন

এন্ড্রিসেন ও এরিক বিনা সেই সময়ই কল্পনা করেছিলেন এমন একদিন আসবে যেদিন আমার ও আপনার মতো সাধারণ মানুষও ইন্টারনেটকে প্রাত্যহিক কাজে ব্যবহার করবে। তারা হয়তো সময়ের তুলনাই স্বপ্ন একটু বেশিই দেখে ফেলেছিলেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তাদের সাথে এই একই স্বপ্ন দেখার দলে শামিল হয় তাদেরই আরো কিছু সহপাঠী। এন্ড্রিসেন, বিনা ও তার বন্ধুরা মিলে দিনরাত নিরলস প্রোগ্রামিং করছিলেন, ইন্টারনেটকে করে তুলছিলেন ইমেজ, অডিও আর ভিডিও কম্পাটিবল। সবসময়ই তারা সুযোগ খুঁজছিলেন কিভাবে ওয়েবকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলা যায়, কিভাবে একে সাধারণ মানুষের কাছে আরো সহজবোধ্য করে তোলা যায়। আর এই পরিশ্রমেরই ফসল হলো বিশ্বের প্রথম গ্রাফিকাল ওয়েব ব্রাউসার “মোজাইক (Mosaic)” । জেনে রাখুন, আজকে আপনি ওয়েব ব্রাউসিংয়ের জন্য যেই ওয়েব ব্রাউসারই ব্যবহার করুন না কেন, তা হচ্ছে এন্ড্রিসেন-বিনা’র আবিষ্কৃত সেই মোজাইক ব্রাউসারেরই কোন উত্তরসূরী। ইন্টারনেটের ইতিহাসে মোজাইকের আগমন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কেননা মোজাইকের আগমণের মধ্য দিয়ে ইন্টারনেট প্রথমবারের মতো রিসার্চ নেটওয়ার্ক আর বিজ্ঞানীদের যন্ত্রের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয়েছিলো, পরিণত হয়েছিলো তথ্য-সম্প্রচারের আরেকটি মাধ্যমে। ১৯৯৩ সালের শেষের ভাগে মোজাইকের একটি বেটা ভার্শন ইন্টারনেটে বিনামূল্যে ডাউনলোডের জন্য দেয়া হয়। মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পরে পুরো বিশ্বে অনেকটা ভাইরাসের মতো।

খুব স্বাভাবিকভাবেই এমন একটি যুগান্তকারী আবিষ্কারের প্রতিদ্বন্দী থাকবে এটাই স্বাভাবিক। আর সেই সময় মাইক্রোসফটের চাইতে বড় প্রতিদ্বন্দী আর কেইবা হতে পারতো। কিন্তু মাইক্রোসফটের প্রতিদ্বন্দী হয়ে ওঠার ক্ষমতা মোজাইক তখনো লাভ করেনি, তার জন্য প্রয়োজন ছিলো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আর টাকা……অনেক অনেক টাকা। যাক সে কথায় পরে আসছি। তখনো পর্যন্ত মোজাইক ছিলো কিছু বিশোর্ধ ভার্সিটি পড়ুয়া ছাত্রের শখের আবিষ্কার। কিন্তু এই সখের আবিষ্কার বিনিয়োগকারীদের সুনজরে পড়তে সময় লাগেনি। সেই বিনিয়োগকারীদেরই একজন ছিলেন জিম ক্লার্ক।
Nafis Iftekhar 1226146496 2 vlcsnap 104426 ইন্টারনেটের ইতিহাস না জানলে দেখতে পারেন
জিম ক্লার্ক

জিম ক্লার্ক ছিলেন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্সের প্রভাষক। ক্লার্ক ছিলেন বিখ্যাত “সিলিকন গ্রাফিক্সের” প্রতিষ্ঠাতা। সিলিকন গ্রাফিক্সের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ক্লার্ক পেয়েছিলেন ব্যাপক সুখ্যাতি আর আয় করেছিলেন অনেক টাকা। কিন্তু সিলিকন গ্রাফিক্সের পর জিম ক্লার্ক চাইছিলেন নতুন ও বড় কোন প্রজেক্ট। যখন তিনি মোজাইকের কথা শুনলেন ক্লার্ক বুঝে গেলেন তিনি যা খুঁজছেন তা তিনি পেয়ে গিয়েছেন। ৯৪’ সালের এর ফেব্রুয়ারীতে মার্ক এন্ড্রিসেন জিম ক্লার্কের কাছ থেকে একটি ইমেইল পান যেখানে বলা হয়েছিলো ক্লার্ক নতুন একটি সফটওয়্যার কোম্পানী খুলতে চান এবং এন্ড্রিসেনকে সেখানে পেলে তিনি বড়ই খুশি হবেন। এন্ড্রিসেন তখন মাত্র গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছেন। সুতরাং এরকম একটি অফার পেয়েও না বলার প্রশ্নই ওঠে না। শীঘ্রই এন্ড্রিসেন তার দলবল নিয়ে জিম ক্লার্কের সাথে দেখা করেন। এন্ড্রিসেন আর ক্লার্কের মধ্যে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা চলে কিভাবে মোজাইককে একটি লাভজনক প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা যায়।

যদিওবা জিম ক্লার্ক বুঝতে পেরেছিলেন ইন্টারনেটের অপার সম্ভাবনার কথা, কিন্তু অনেকেই ছিলেন যাদের মাথায় এই সহজ-সরল কথাটি তখনো ঢোকেনি। সেই না-বোঝার দলে এমন একজন ছিলেন যার কথা শুনলে আপনি ভুরু কপালে তুলবেন – বিল গেটস!
Nafis Iftekhar 1226159300 3 vlcsnap 25695 ইন্টারনেটের ইতিহাস না জানলে দেখতে পারেন
বিল গেটস

Nafis Iftekhar 1226159849 4 vlcsnap 25719 ইন্টারনেটের ইতিহাস না জানলে দেখতে পারেন
বিল গেটস ও পল এ্যালোন

বিল গেটসের কথা আমরা কে না জানি। বিল গেটস ছিলেন “মাইক্রোসফটের (Microsoft)” সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও CEO (অপর প্রতিষ্ঠাতা পল এ্যালোন)। তখন যুগটা ছিলো মাইক্রোসফটের। বিল গেটসের তথা মাইক্রোসফটের স্বপ্নটা ছিলো খুব সোজা সাপটা কিন্তু বৃহৎ – পৃথিবীর প্রতিটি অফিস, বাসা-বাড়ির কম্পিউটার চলবে মাইক্রোসফট উইন্ডোজের অপারেটিং সিস্টেম দ্বারা। ১৯৯৩ এ গেটস এই স্বপ্ন পূরণের প্রায় দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলো যখন পৃথিবীর প্রায় ৯০% পিসি মাইক্রোসফট উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম দ্বারা চালিত হচ্ছিলো। আর এই স্বপ্ন পূরণ করার কাজটি মাইক্রোসফট করছিলো বেশ শক্ত হাতে। আর এই কাজের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বিল গেটস – মাইক্রোসফটের তুখোড়ের চেয়েও তুখোড় সেই ব্যাক্তিটি, যিনি তার শক্ত ও রূঢ় মানসিকতার জন্য পরিচিত ছিলেন। আরেক কথায় বোকাদের জন্য কোন স্থান মাইক্রোসফটে ছিলো না। মাইক্রোসফট কখনোই তার প্রতিদ্বন্দীদের সাথে বালখিল্যতায় মেতে ওঠেনি, বরং সবসময়ই চেষ্টা করেছে কৌশলে তাদেরকে নির্মূল করতে। এমনকি Lotus , Word Perfect , Borland , IBM এর মতো পরাক্রমশালী সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানকেও মাইক্রোসফটের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়েছিলো। বিল গেটস নিজে জানতেনও তার ক্ষমতা সম্পর্কে। একরাতে এক ডিনার পার্টিতে বিল ক্লিনটনের প্রেসিডেন্ট ইলেকশন নিয়ে কথা চলছিলো। কথায় কথায় বিল গেটস হঠাৎই বলে ওঠেন – “আমিও ক্ষমতার দিক দিয়ে প্রেসিডেন্টের চাইতে কম না……..”। কথাটা বলা মাত্রই বিল গেটসের স্ত্রী তাকে টেবিলের নিচে পা দিয়ে খোঁচা দিয়ে থামিয়ে দেন। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি – বিল গেটস হয়তো খুব একটা ভুল বলেননি! এক মাইক্রোসফট কর্মীর মতে – “যদি গেটসের সাথে আপনি আধাঘন্টার মিটিং করেন এবং কমপক্ষে ১৫ বার Idiot কথাটা না শুনেন তাহলে বুঝবেন যে আপনি সফল!” আপনি স্মার্ট নাকি হ্যান্ডসাম এটা কোন বিবেচ্য বিষয় ছিলোনা মাইক্রোসফটের কাছে। মেধাকে তারা আর যেকোন কিছুর চাইতে উপরে স্থান দিতো। আর তাই হয়তো তৎকালীন মাইক্রোসফটের কর্মীদের গড় বয়স ছিলো মাত্র ২৬ বছর। মাইক্রোসফটের মেধাবী এই কর্মীবাহিনী, ব্যাংকে বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা আর উইন্ডোজ ৯৫ এর অতি শীঘ্রই বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা – বিল গেটস স্বপ্ন দেখছিলেন টেকনোলজি ভুবনের অজেয় সম্রাট হবার। সব মিলিয়ে গেটস বেশ সুখেই ছিলেন বলতে হবে। কিন্তু মাইক্রোসফটের এ সাফল্য একদিনে আসেনি। গেটস নিজেও জানতেন, যেভাবে অদম্য সাহস আর মেধাকে সম্বল করে তার নিজের হঠাৎ উত্থান ঘটেছিলো, ঠিক তেমনিভাবেই, যেকোন সময় তাকে টেক্কা দেবার মতো লোকের আবির্ভাব ঘটতে পারে।

ওদিকে জিম ক্লার্ক, মাইক এন্ড্রিসেন ও তার দলবল তখনো ব্যস্ত মোজাইককে আরো উন্নত এবং সর্বোপরি লাভজনক করে তুলতে। প্রজেক্টের নতুন নামও দেয়া হয় – নেটস্কেপ (Netscape)। আসলে ক্লার্ক চাইলেও হয়তো অস্বীকার করতে পারবেন না যে তার আগ্রহ যতোটা না প্রযুক্তিটাকে উন্নত করাতে ছিলো তার চেয়ে অনেক বেশি ছিলো এক লাভজনক করে তুলতে। যদিও গেটস নেটস্কেপের সাফল্যের ব্যাপারে সন্দিহান ছিলেন, তথাপি মাইক্রোসফটের কিছু কর্মী সমূহ বিপদের গন্ধ ঠিকই পাচ্ছিলেন। এমনই এক কর্মী অনেকটা বন্ধুসুলভ মনোভাব থেকেই নেটস্কেপের কাছে ফোন দেন, কথা বলেন ওখানকার একজন এক্সিকিউটিভের সাথে। কিন্তু মাত্র ১৫ মিনিট কথা বলে ফোন রেখে দেয়া হয় এবং নেটস্কেপের কাছ থেকে প্রায় ইঙ্গিতপূর্বকভাবে বলে দেয়া হয় – “আমাদের কোন আগ্রহ নেই এবং ভবিষ্যতে আর ফোন করার চেষ্টাও কোরো না……”। এ ঘটনায় মাইক্রোসফট হয়েছিলো বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যেখানে “মাইক্রোসফটের ফোন এসেছে!” বলে উচ্ছসিত হয়ে ওঠে, নেটস্কেপের মধ্যে এমন কোন ভাবই ছিলো না। মাইক্রোসফটও বুঝে নেয় নেটস্কেপ এখন থেকেই তাদেরকে শত্রু বলে ভাবতে শুরু করেছে।

Nafis Iftekhar 1226164058 6 netscape 1 ইন্টারনেটের ইতিহাস না জানলে দেখতে পারেন

অবশেষে ১৯৯৪ সালের ১৩ই অক্টোবর, মাসের পর মাস কোডিং আর প্রোগ্রামিংয়ের পর, এন্ড্রিসন বাহিনী তাদের উদ্ভাবিত নতুন ব্রাউসার নেটস্কেপ ন্যাভিগেটর (Netscape Navigator) বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত করে দেয়। যেমনটা আশা করা গিয়েছিলো, অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই নেটস্কেপ ব্যপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং ১০ লক্ষ ডাউনলোড সীমা ছাড়িয়ে যায়। এর আগে বিশ্ববাসী আর কোন সফটওয়্যারের এমন বিপুল জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করেনি। আর অনেকটা অবধারিতভাবেই এই জনপ্রিয়তা নেটস্কেপের জন্য বয়ে নিয়ে আসে প্রতিদ্বন্দীতার খরস্রোত। মাইক্রোসফট নেটস্কেপের এই অভূতপূর্ব সাফল্য দেখে হয়ে গিয়েছিলো নির্বাক ও অনেকটাই ভীত। নির্বাক – কারন তাদের কাছে ছিলো না নেটস্কেপের বিপরীতে কোন জবাব। আর ভীত – কারন মাইক্রোসফট নেটস্কেপকে দেখছিলো একটি বিকল্প সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে। যেমন করে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম হচ্ছে সর্বোচ্চ সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম, যার ওপর ভিত্তি করে অন্যান্য সফটওয়্যার চালানো হয়। মাইক্রোসফট ওয়েবকে কল্পনা করেছিলো আরেকটি নতুন সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে, যেখানে মানুষ ইন্টারনেটে থেকেই সব ধরনের প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার চালাবে আর যাবতীয় কম্পিউটার চাহিদা মেটাবে। নেটস্কেপকে তারা দেখেছিলো সেই প্ল্যাটফর্মের চালক হিসেবে। আর তাই মাইক্রোসফটের ভয়টা অমূলক ছিলোনা মোটেও।

অনেকটা হঠাৎ করেই বিল গেটসের মাথায় ইন্টারনেটের গুরুত্বটা খেলে যায়। একরাতে বিল গেটস তার সকল কর্মীকে একটি ইমেইল করেন। সে ইমেইলে তিনি ইন্টারনেটকে অভিহিত করেন পিসির পর দ্বিতীয় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হিসেবে। নেটস্কেপের ব্যাপারে তিনি বলেন, নেটস্কেপ হলো সেই কোম্পানী যার সাথে মাইক্রোসফটের অব্যশই তাল মেলাতে হবে ও ভবিষ্যতে ছাড়িয়ে যেতে হবে। নেটস্কেপ খুব ভালোভাবেই জানতো বিল গেটস প্রতিশোধ নেবেন এবং যখন নেবে সে অনুভূতি খুব একটা সুখকর হবে না। আর এজন্যেই তারা ভাড়া করে সিলিকন ভ্যালির Lawyer গ্যারি রিব্যাককে যিনি বিখ্যাত ছিলেন মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের হয়ে মামলা লড়ার জন্য।

Nafis Iftekhar 1226164773 7 vlcsnap 78341 ইন্টারনেটের ইতিহাস না জানলে দেখতে পারেন
গ্যারি রিব্যাক

এরই মধ্যে মাইক্রোসফট কর্তৃপক্ষ তাদের একটি বিশেষ টিম পাঠান নেটস্কেপ কার্যালয়ে এক বিশেষ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসার জন্য। ৬ ঘন্টা দীর্ঘ এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে কি ঘটেছিলো তা নিয়ে অনেক অনেক বিতর্ক আছে। তবে মাইক্রোসফটের মতে, এই ৬ ঘন্টা তারা নেটস্কেপের টেকনিক্যাল টিমের সাথে এক বন্ধুসুলভ ও প্রাণবন্ত আলোচনায় মেতে উঠেছিলো। কিন্তু নেটস্কেপ বলে যে, মাইক্রোসফট তাদের কাছে একটি প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলো, মাত্র ১০ লক্ষ ডলারের বিনিময়ে নেটস্কেপকে কিনে নেবার জন্য। যদি নেটস্কেপের দাবী সত্য হয়ে থাকে তবে মাইক্রোসফট প্রকৃতপক্ষে আইন ভঙ্গ করেছিলো, আরেকটু পরিষ্কার করে বলতে গেলে মাইক্রোসফট ভঙ্গ করেছিলো “এ্যামেরিকান এন্টি ট্রাস্ট ল” (American Anti Trust Law)। এই আইনে বলা আছে, কোন প্রতিষ্ঠান তার কোন একটি পণ্যের একচেটিয়া বাজারের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে অপর আরেকটি পণ্যেকে লাভজনক করতে পারবে না। যে একচেটিয়া বাজারের কথা এখানে বলা হচ্ছে, বিশেষজ্ঞদের মতে তা মাইক্রোসফটের ছিলো তাদের উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের বদৌলতে। ঐ বিতর্কিত মিটিংয়ের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই নেটস্কেপ US Justice Department কে মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে এ্যান্টি ট্রাস্ট কাউন্সিল গঠনের অনুরোধ করে। মাইক্রোসফট নেটস্ক্যাপের পক্ষ হতে তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া সব অভিযোগ অস্বীকার করে।

প্রতিষ্ঠান গঠনের মাত্র ১ বছরের মাথায়ই নেটস্কেপ বাজারে তাদের শেয়ার ছাড়ে। মুহূর্তেই নেটস্কেপ অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে সর্বকালের সর্বাধিক দ্রুত বর্ধনশীল সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। নেটস্কেপ নিজেদেরকে অজেয় ভাবতে শুরু করে। সাফল্যের ছোঁয়া লেগেছিলো এন্ড্রিসেন বাহিনীর জীবনেও। মুহূর্তেই টাকার সাগরে ভাসতে থাকেন তারা। ওদিকে সাফল্যের খুশিতে অন্ধপ্রায় এবং অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাসী জিম ক্লার্ক মিডিয়ার কাছে মাইক্রোসফট ও উইন্ডোজকে ক্রমাগত সমালোচনার তীরে বিদ্ধ করছিলেন। তার করা উক্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাতটি হলো – “Windows will be a poorly debugged set of device drivers”। উক্তিটি শুনতে হয়তো আপনার আমার কাছে অতোটা খারাপ লাগছে না। কিন্তু বিল গেটসের কাছে এই উক্তিটি হচ্ছে অনেকটা তার মায়ের নাম তুলে গালি দেয়ার শামিল।

অবশেষে মাইক্রোসফট ৭ ডিসেম্বর, ১৯৯৫ এ মাইক্রোসফট তাদের নিজেদের উদ্ভাবিত ব্রাউসার ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার (Internet Explorer) বাজারে ছাড়ে। দিনটা ছিলো ঐতিহাসিক পার্ল হারবার (Pearl Harbor) আক্রমণের দিন। ঐ রাতে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারের উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত এক পার্টি শেষে মাইক্রোসফটের টেকনিক্যাল টিমের কিছু সদস্য ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারের একটি বিশাল “e” আকৃতির লোগো পিকআপে ভ্যানে তুলে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত নেটস্কেপের কার্যালয়ের সামনে ফেলে রেখে আসেন।

Nafis Iftekhar 1226166791 7 vlcsnap 98856 ইন্টারনেটের ইতিহাস না জানলে দেখতে পারেন
সেই বিশালাকৃতির “e” চিহ্নিত ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারের লোগোটি

এই ঘটনার মাধ্যমে মাইক্রোসফট যেন অনেকটা যুদ্ধের দামামা-ধ্বণি বাজালো এর মাধ্যমে। মাইক্রোসফটের পরিকল্পনা ছিলো খুব সোজা। নেটস্কেপের প্রতিটা পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করা আর তার পুনরাবৃত্তি করা, আরো সোজা ভাষায় বলতে গেলে অনুকরণ করা। অনুকরণ বলুন আর কৌশল, মাইক্রোসফট ধীরে ধীরে তার অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছাতে শুরু করলো। এমনকি মাইক্রোসফট ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারকে উইন্ডোজের সাথে বিনামূল্যে বিতরণ করতে শুরু করলো। মাইক্রোসফট তথা বিল গেটস তার প্রভাব খাটিয়ে সফটওয়্যার বিতরণকারী এজন্টদেরকে হাত করে ফেললেন ও ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য ও নেটস্কেপকে সর্বস্বান্ত করতে সম্ভাব্য সব কিছু করলেন। ধীরে ধীরে নেটস্কেপের শেয়ার মূল্য কমতে আরম্ভ করলো। অনেকটা হতভম্ব নেটস্কেপ তাদের শেষ চালটি চাললো। শুরু হলো মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে আনা এ্যান্টি ট্রাস্ট মামলার শুনানি। এই শুনানিতে বিল গেটসকে ঘন্টার ঘন্টা এবং মাসের পর মাস ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তার প্রতিটি জবাব ভিডিও রেকর্ডিং করা হয়।

Nafis Iftekhar 1226167083 8 vlcsnap 103432 ইন্টারনেটের ইতিহাস না জানলে দেখতে পারেন
চলছে জিজ্ঞাসাবাদ

জিজ্ঞাসাবাদকালে বিল গেটস তাদের ও নেটস্কেপের মধ্যে সেই বিতর্কিত রুদ্ধদ্বার বৈঠকের কথা সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ স্বরূপ মাইক্রোসফটের কর্মীদের কাছে তারই করা একটি ইমেইলে বৈঠকের উল্লেখ দেখানো হলে গেটস নিশ্চুপ হয়ে যান। এই পুরো জিজ্ঞাসাবাদ প্রক্রিয়াটি গেটসকে মানসিকভাবে প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছিলো। গেটস কোন কোন প্রশ্নের জবাবে শিশুর ন্যায় আচরণ করেছেন। একবার তাকে একটি জিজ্ঞাসাবাদ-ফর্ম পূরণ করতে দিলে বিল গেটসকে বিচারক ফর্মে তার একটি উত্তর নিয়ে জিজ্ঞেস করলে গেটস বলেন:

বিল গেটস: “আমি ওটা টাইপ করিনি…….”
বিচারক: “কে টাইপ করেছে?”
বিল গেটস: “কম্পিউটার।”

এমনকি একবার এক বোর্ড মিটিংয়ে বিল গেটসকে অশ্রুসজল অবস্থায়ও দেখা যায়। আসলে কোনোদিন কারো প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য না থাকা বিল গেটসকে হঠাৎ করেই এমন সব প্রশ্ন করা হচ্ছিলো যার জবাব তিনি এড়িয়ে যেতে পারছিলেন না। আর এই জিনিসটাই বোধোহয় তাকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছিলো।

সবকিছু পর্যালোচনা শেষে আদালত বিল গেটস ও মাইক্রোসফট কর্পোরেশনকে দোষী হিসেবে সাব্যস্ত করে এবং কোম্পানী দুই ভাগে ভাগ করে দেবার সিদ্ধান্ত দেয়। এই সিদ্ধান্তের ফলে মাইক্রোসফট শেয়ার বাজারে একদিনের মধ্যেই প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার হারায়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০০৮ এ বিল গেটস মাইক্রোসফট কর্পোরেশনের দায়ভার স্টিভ বালমারের হাতে ছেড়ে দিয়ে অবসর গ্রহণ করেন। এই ঘটনার পর মানসিকভাবে বিল গেটস পুরোপুরি বদলে যান। অফিসের কাজের পাশাপাশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন দাতব্য সংস্থার কার্যক্রম নিয়ে। অনেকের মতেই ব্রাউসার যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি। ২য় ব্রাউসার যুদ্ধ বর্তমানে চলছে ফায়ারফক্স আর ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারের মধ্যে।

* ডিসকভারি চ্যানেলে প্রচারিত Download – The True History of Internet অনুষ্ঠান অবলম্বনে রচিত।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s